বাংলাদেশে প্রাইমারি জ্বালানির ঘাটতি আছে। তবে এটিকে সংকট বলব না। এ সমস্যা অটোমেটিক হয়নি। একশ্রেণীর রাজনীতিবিদ ও তাদের সহযোগী ব্যবসায়ীরা এটি তৈরি করেছেন। এ সংকট কেমন? চহিদা না থাকালেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে অপ্রয়োজনীয় সক্ষমতা তৈরি করা হয়েছে। রূপসায় এডিবির অর্থায়নে ৮ হাজার কোটি টাকায় একটি পাওয়ার প্লান্ট করা হয়েছে। ৮০০ মেগাওয়াটের পাওয়ার প্লান্ট, কিন্তু সেখানে গ্যাস নেই। বেসরকারি এমন অনেক খাতে ক্যাপাসিটি যুক্ত করা হয়েছে, যেখানে কোনো গ্যাস সরবরাহ নেই। গ্যাস নেই জেনেও অনেক জায়গায় লাইন দেয়া হয়েছে। সেখানে গ্যাস যাবে না জেনেও লাইন দেয়া হয়েছে। এগুলো দুর্নীতির মাধ্যমে করা হয়েছে। এসব কারণেই আমরা এ সমস্যায় পড়েছি।
বিদ্যুৎ সংযোগ আপনি এক জায়গায় বন্ধ করে আরেক জায়গায় দিতে পারেন। বিদ্যুতে একটি ফিডার বন্ধ করে আরেকটি চালু করা যায়। কিন্তু গ্যাসে সেটি করা যায় না। আরেকটি সমস্যা হচ্ছে শিল্পে, বাসাবাড়িতে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সংযোগ দেয়া হয়েছে। এসব অপকর্ম করেছেন আমাদের রাজনীতিবিদরা।
আমরা ঘাটতির মধ্যে আছি, কিন্তু সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছি। ঘাটতি মেটাতে স্থলভাগে বাপেক্সের অনুসন্ধান বাড়িয়েছি। আমরা বাপেক্সের জন্য রিগ কিনছি। যদিও এখানে সন্তোষজনক অগ্রগতি হয়নি। বছরে আমাদের স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট করে কমছে। আমরা ৭০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাস পাচ্ছি। আশা করছি ভোলাসহ অন্যান্য জায়গায় আমরা আরো গ্যাস পাব। তাহলে ঘাটতি কমে আসবে।
এখন ঘাটতি মেটাতে আমরা এলএনজি আমদানি করছি। এর জন্য নানা সমালোচনা হচ্ছে। কারণ এলএনজি উচ্চমূল্যের। আমরা বাধ্য হয়ে আমদানি করছি। না হলে শিল্প-কারখানাসহ সবজায়গায় ধস নামবে। গত বছর আমরা ৮৪ কার্গো এলএনজি আমদানি করেছিলাম। এ বছর ১০৮ কার্গো এলএনজি আমদানি করেছি। কিন্তু আমাদের এফএসআরইউর (ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট) যে সক্ষমতা আছে সেখানে ১১৫টি কার্গো সংরক্ষণ করা যায়। অর্থাৎ আর মাত্র সাতটি কার্গো আনতে পারব। প্রয়োজনে আমরা এফএসআরইউ বাড়াব।
এ রকম পরিস্থিতিতে এলপিজি একটি বড় সমাধান হতে পারে। এর সুবিধা হলো খুব সহজেই আনা যায়। কিন্তু এলএনজি আনা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। গ্যাসের যেকোনো প্রসেস প্ল্যান করতে দুই-তিন বছর লেগে যায়। কিন্তু আমরা স্বল্পমেয়াদি সরকার। একটি গ্যাসলাইন করতে দুই-তিন বছর লেগে যায়। এফএসআরইউ করতেও একই রকম সময় লাগে। ল্যান্ড বেজড গ্যাস টার্মিনাল করতে পাঁচ-ছয় বছর লেগে যায়। সেজন্য এখানে এলপিজি বড় সমাধান হতে পারে।
এলপিজির মূল সমস্যা নিয়ে আগের বক্তারা বলেছেন—এর মূল্য বেশি। এলপিজির বৃহৎ অংশই বেসরকারি খাতের। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন কিছু এলপিজি বাজারজাত করে। কিন্তু এখানে বেসরকারি খাতের যে এফিশিয়েন্সি, সেটি পাচ্ছি না। বর্তমানে এলপিজির দাম ১ হাজার ২০০ টাকার বেশি। এর দাম ১ হাজার টাকার নিচে আসা উচিত। গ্রাহকের জন্য আরো মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হচ্ছে, এই ১ হাজার ২০০ টাকার এলপিজি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায়। এটি বন্ধ করতে হবে। আমরা মোবাইল কোর্ট করব। সরবরাহকারীদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। দায়দায়িত্বহীন ব্যবসা—কেউ দায় নেবে না—এটি হতে পারে না। এলপিজির দাম ১ হাজার টাকার নিচে আনতে যে ধরনের লজিস্টিক সহযোগিতা দরকার আমরা সেটি দেখব। আমরা বেসরকারি খাতের পুরো এফিশিয়েন্সি পেতে চাই।
এলপিজির দাম কমাতেই হবে। শিল্প খাতে এলপিজি ব্যবহার আরেকটি চ্যালেঞ্জ। কারণ দামের কারণে এটি বিদ্যুৎ কারখানা বা বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। তাই এলপিজির দাম কমানোটাই চ্যালেঞ্জ। এ নিয়ে সবাইকে কাজ করতে হবে। ব্যবসায়ীদের এখানে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। ব্যবসায়ীদের মুনাফা আর বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়া, সম্পদ পাচারের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ দেশ যদি না থাকে আপনারা কোথায় থাকবেন? ৫ আগস্টের আগে যারা এসব করেছে তারা আজ কোথায়?
তাই আমি বলতে চাই, এলপিজির দাম কমিয়ে আনতে হবে। সেটি বাসাবাড়ির রান্নার জন্য হোক কিংবা শিল্পের জন্য। এলপিজি শিল্পকে কীভাবে বাড়ানো যায় সে বিষয়ে গবেষকরা কাজ করবেন। আমাদের পূর্ণাঙ্গ জ্বালানি কৌশলে যেন এলপিজি বড় অবদান রাখতে পারে সেজন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।